PROGGA

Knowledge for Progress

দ্বীপচরের শিশুরাও আগামী দিনের ভবিষ্যৎ

শিক্ষা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতি সন্তোষজনক। বিশেষ করে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে সারাদেশে ৮৫,০০০ সরকারি ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (ডি.এস. ১৭ অগাস্ট, ২০১২) এবং ৪০,০০০ ব্রাক স্কুল, ২০,০০০ কিন্ডারগার্টেন স্কুল (ডি.পি.ই. ২০০৮) রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্প ও এনজিও দ্বারা পরিচালিত স্কুলের সংখ্যাও কম নয়। এ সকল প্রতিষ্ঠনে প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে ৮০% ছেলে-মেয়ে, যার সিংহ ভাগই বাস করে বিভিন্ন শহর এবং কাঠামোগত দিক দিয়ে উন্নত গ্রামাঞ্চলে। শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত অবশিষ্ট ২০% ছেলে-মেয়ের বেশির ভাগই বসবাস করে চর/দ্বীপচর, হাওর, সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং দুর্গম পাহাড়ী এলাকার মতো পরিবেশ ও প্রতিবেশ এবং আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলোতে।

উত্তরাঞ্চলের ৫১টি দ্বীপচরের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব এলাকার প্রায় ৫৬ শতাংশ শিশু কখনই স্কুলে যায় না, যার অন্যতম প্রধান কারণ স্কুল না থাকা। স্কুলে না যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ আর্থিক অস্বচ্ছলতা। প্রায় ৮৫ ভাগ চরপরিবারের পক্ষেই ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানো সম্ভব হয়না। পড়াশোনার খরচ চালানোর সঙ্গতি মোটামুটি কোনো চরবাসীরই নেই। তারপরও ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে অনেক বাবা-মা তাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠান। জরিপে দেখা গেছে নীলফামারীতে ১০০ ভাগ, লালমনিরহাটে ৮৫ ভাগ এবং পাবনায় ৭০ ভাগ চর পরিবারের পক্ষে ছেলে-মেয়েদের স্কুলের খরচ মেটানোর আর্থিক সক্ষমতা নেই। তারপরও যারা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের শিক্ষা খরচের চিত্র রীতিমত ভয়াবহ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মাথাপিছু মাসিক গড় শিক্ষা খরচ মাত্র ৫৬ টাকা, যা চরবাসীদের মোট মাসিক খরচের মাত্র ১.৫ শতাংশ। এই সামান্য ক’টি টাকা খরচের সামর্থ্যও বেশিরভাগ চরবাসীর নেই। কারণ তাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই চলে যায় খাদ্য-চাহিদা মেটাতে।

অন্যদিকে যেসব ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে না তাদের ওপর জরিপ করে দেখা গেছে, ছেলেদের শতকরা ৪৯ ভাগ আগে পড়তো কিন্তু এখন পড়ছে না এবং বাকি ৫১ ভাগ কখনই স্কুলে যায়নি। মেয়েশিশুদের মধ্যে ৪১ ভাগ আগে স্কুলে যেত এবং ৫৯ ভাগ কখনই স্কুলে যায়নি। পড়ালেখা বন্ধ করে দেওয়ার কারণ হিসেবে মূলত আর্থিক অসঙ্গতিকেই দায়ী করেছেন তারা। এছাড়া ছেলেদের ক্ষেত্রে অনেককেই আয় রোজগারের পথে নামতে হয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে কারণটা অন্যরকম, মেয়ে বড় হয়ে গেলে বাবা-মায়েরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করেন। চরের সবচেয়ে কাছের স্কুলটাতে যেতেও মাইলের পর মাইল হাঁটতে হয়। এ কারণে বাবা মায়েরা মাঝপথে তাদের লেখাপড়া বন্ধ করে দেন। এছাড়া বাল্যবিবাহের বিষয়টা তো আছেই।

বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন উপায়ে চরবাসীদের কাছে গিয়ে, তাদের সাথে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে আমরা উত্তরাঞ্চলের দ্বীপচরগুলোর শিক্ষা ব্যবস্থার যে চিত্রটি পাই সেটি রীতিমত অমানবিক। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চরগুলোতেও প্রায় একই রকম পরিস্থিতি বিরাজ করছে। চরের মানুষকে শিক্ষা সেবা পৌঁছে দিতে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের আন্তরিক সহযোগিতা।

বিগত প্রায় দেড় দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র বিমোচনে বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মত মানবদারিদ্রের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করলেও দেশের বেশকিছু অঞ্চল এখনও অবহেলিতই রয়ে গেছে। যার প্রায় ৬০ লাখ মানুষই বাংলাদেশের চর অঞ্চলে বসবাসরত। উত্তরবঙ্গের ৫১টি দ্বীপচরের প্রায় ৭৭ শতাংশ পরিবারই হতদরিদ্র। বন্যা, খরা, নদীভাঙনসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগই যেন তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেক মানুষ নিঃস্ব হয়, নদীগর্ভে তলিয়ে যায় ফসল ঘরবাড়ি। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও জোটেনা পরিবারের সকল সদস্যের একবেলা পেটপুরে খাবারের নিশ্চয়তা। প্রতিনিয়ত দারিদ্রের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত চরের এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা। অধিকাংশ চরের মানুষের আয় কৃষি ও নদীনির্ভর, যেখানে নেই কোন সুপরিকল্পিত বা বিষেশায়িত জ্ঞান। চরবাসীরা প্রায় ৮-৯ মাসই থাকে কর্মহীন। বিভিন্ন মৌসুমে জীবিকার তাগিদে দ্বীপের কর্মক্ষম পুরুষদের ছোটাছুটি করতে হয় অন্যত্র। বাদ পরে না শিশুরাও, প্রায় প্রতিটি ছোট ছোট কোমলমতি শিশু হারভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছে পরিবারের খাদ্য চাহিদা মেটাতে। অথচ এদের মধ্যে কোন শিশুই হয়ত জানে না যে, অন্যদের মতো তাদেরও আছে শিক্ষালাভের সমান অধিকার।

বাংলাদেশের চরাঞ্চলের বাসিন্দারা এ সকল নানাবিধ বঞ্চনা ও দুর্যোগ কবলিত হয়ে অনিশ্চিতয়তার ভেতর জীবনযাপন করে। যে কোন সময় তাদের জীবনে নেমে আসতে পারে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ের দুর্ভোগ। চরবাসিরা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার বিবিধ সুযোগ-সুবিধার আওতার বাইরে অবস্থান করে। বিশেষ করে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত চরের হাজার হাজার কোমলমতি শিশুদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উপযোগী করে তুলতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে চরের শিশুদের সম্ভবনাকে বিকশিত করা সম্ভব এবং এজন্যই চরে প্রাক-প্রাইমারী স্কুলের প্রয়োজন, যা শিশুর বিকাশে সহায়তা করবে।

House 6 (3rd Floor, East Side), Main Road 3, Block A, Section 11, Mirpur, Dhaka-1216
Tel:+88-02-9005553, Fax:+88-02-8060751 Email:progga.bd@gmail.com , info@progga.org
URL : www.progga.org , Skype ID: progga.bd